আজ শুক্রবার,৭ই কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,২৩শে অক্টোবর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,সকাল ৯:৩৭

আত্মিক বিশুদ্ধতায় কুরবানি

Print This Post Print This Post

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বাৎসরিক ঈদ হিসেবে দুটি দিন দান করেছেন। ঈদুল ফিতরের দিন এবং ঈদুল আযহার দিন। (আবু দাউদ, আস-সুনান ১/২৯৫ হাকিম আল মুসতাদরাক ১/৪৩৪)

চলতি বছর আমাদের থেকে ঈদুর ফিতর বিদায় নিয়েছে। সামনে আসছে ঈদুল আযহা। ঈদুল আযহার একটি অন্যতম ইবাদাত হল কুরবানি করা। যাদের সামার্থ্য আছে তাদের জন্য কুরবানি করা ওয়াজিব। আর যাদের সামার্থ্য নাই, তারাও ইচ্ছা করলে কুরবানি দিতে পারে।

কুরবানি শব্দটা মুলত আরবি ‘কুরব’ বা ‘কুরবান’ শব্দ থেকে নিগর্ত। যার অর্থ হল নৈকট্য লাভ, সান্নিধ্য। যে বস্ত কারো নৈকট্য লাভের উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেটাকে বলা হয় কুরবান। আর তা থেকেই কুরবানি। এছাড়া কুরবানিকে নাহার, নুসুক, আযহা ও বলা হয়।

শরীয়াতের পরিভাষায়ঃ

আল্লাহর সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নিদিষ্ট তারিখে বিধান মুতাবেক বিশেষ বিশেষ পশুকে আল্লাহর নামে যবেহ করাকে কুরবানি বলা হয়।

প্রত্যেক জাতির জন্য কুরবানির বিধান ছিল :

আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

প্রত্যেক জাতির জন্য আমি কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি; যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরন করতে পারে, যে সমস্ত জন্তু তিনি রিযিক হিসেবে দিয়েছেন তার উপর।

তোমাদের ইলাহ তো এক ইলাহ; অতএব তাঁরই কাছে আত্মসমপর্ণ করো। অনুগতদেরকে সুসংবাদ দাও।(সুরা হাজ্জ -৩৪)

হযরত ইসমাইল (আ.) এর কুরবানির ইতিহাস :

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারীমে বলেন,
অতঃপর যখন সে (ইসমাইল আ.) তাঁর (পিতার) সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো,তখন সে বলল, হে প্রিয় বৎস!আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি, অতএব এ ব্যাপারে তোমার কি অভিমত? সে বলল, হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আমাকে ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। অতঃপর তকরা উভয়ে যখন আত্মসমপর্ণ করল এবং সে তাকে (ইসমাইল আ.কে)কাত করে শুইয়ে দিল, তখন আমি আহ্বান করে বললাম, হে ইবরাহীম, তুমি তো স্বপ্নকে সত্য পরিণত করেছ। নিশ্চয়ই আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের পুরষ্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আর আমি এক মহান (জান্নাতি দুম্বা) যবেহের বিনিময়ে তাকে মুক্ত করলাম। (সুরা সাফফাত -১০২-১০৭)

আত্মিক বিশুদ্ধতা আবশ্যক :

কুরবানি দেওয়ার আগে আমাদের আত্মিক বিশুদ্ধতা অর্জন করতে হবে। কেননা, তাক্বওয়া ব্যতীত আল্লাহ তায়ালার নিকট কুরবানি কবুল হবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ আল্লাহ তায়ালার নিকট (কিন্তু) কখনো (কুরবানির) গোশত, রক্ত পৌছায় না, বরং তাঁর কাছে পৌছায় তোমাদের তাকওয়াটুকুই(সুরা হাজ ৩৭)

এই জন্য আমাদের জন্য আবশ্যক হলো কুরবানির আগে আমাদের নিয়ত বিশুদ্ধ করা। কুরবানি একমাত্র আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে দিতে হবে। লোক দেখানোর উদ্দেশ্য বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য দিলে আমাদের কুরবানি কবুল হবে না।

শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই কুরবানি দিতে হবে :

আমাদের সমাজের অনেক ব্যক্তি আছেন যারা মানুষের চাপে পড়ে কুরবানি দিয়ে থাকেন। অথবা লৌকিকতার জন্য কুরবানি দিয়ে থাকেন অথবা গোশত খাওয়ার আশায় কুরবানি দিয়ে থাকেন। অথবা আল্লাহর জন্য ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে। যারা এমন করে থাকেন তাদের কুরবানি আল্লাহ তায়ালার দরবারে কবুল হবে না।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, অতএব আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যেই সালাত আদায় করুন এবং কুরবানি করুন। (সুরা আল কাউসার-২)।

অন্যত্রে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন :
(হে নবি) আপনি বলুন! অবশ্যই আমার সালাত, আমার কুরবানি,আমার জীবন, আমার মরণ সব কিছুই সৃষ্টিকুলের মালিক আল্লাহ তায়ালার জন্য।(সুরা আল আনআম-১৬২)

তাই আমাদের কুরবানিও একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই দিতে হবে।

কুরবানির ফযিলাত :

হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম রাযি.থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাগণ রাযি. আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এই কুরবানি কি?( অর্থাৎ কুরবানি কি শুধু আমাদের জন্য খাস নাকি পূর্বেও এর প্রচলন ছিলো?) তখন তিনি বললেনঃ (এই কুরবানি) তোমাদের পিতা ইবরাহীম আ. এর সুন্নাত। সাহাবাগন রাযি. পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এতে কোনো সওয়াব আছে নাকি?

তিনি বললেন, কুরবানির জন্তুর প্রত্যেকটি পশমের বিনিময়ে একটি করে সওয়াব রয়েছে। সাহাবাগণ পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! যে সমস্ত জন্তুর পশম গুচ্ছাকারে থাকে (যথা ভেড়া) সেখানে কি এক একটি গুচ্ছ পশম হিসেবে গন্য হবে? তিনি বললেনঃপ্রতিটি পশমের পরিবর্তে একটি সওয়াব পাবে। ( ইবনে মাজাহ, আহমাদ, মিশকাত পৃষ্ঠা নং ১২৯)।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
কুরবানির ঈদের দিনে অন্য কোনো আমল কুরবানি করা অপেক্ষা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় নয়।(তিরমিযি শরিফ)।

সামার্থ্যবান ব্যক্তি কুরবানি না দিলে ঈদগাহে যাওয়া নিষেধ :

হযরত আবু হুরায়রা রাযি.থেকে বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কুরবানি করার সামার্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরাবানি করল না। সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।( ইবনে মাজাহ, ৩১২৩)

তাই আসুন!
কুরবানি দেওয়ার জন্য আমাদের নিয়তকে বিশুদ্ধ করে নিই। কুরবানি একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই দিই। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দিন। (আমীন)

লেখক : মুহাঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন, ঝিনাইদহ

এ জাতীয় আরো সংবাদ