আজ বৃহস্পতিবার,১৪ই শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ,২৯শে জুলাই ২০২১ খ্রিস্টাব্দ,সকাল ৯:০৫

আত্মিক বিশুদ্ধতায় কোরবানি

Print This Post Print This Post

শৈলবার্তা ইসলামি ডেস্ক :
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বাৎসরিক ঈদ হিসেবে দুটি দিন দান করেছেন। ঈদুল ফিতরের দিন এবং ঈদুল আযহার দিন। (আবু দাউদ, আস-সুনান ১/২৯৫ হাকিম আল মুসতাদরাক ১/৪৩৪)

চলতি বছর আমাদের থেকে ঈদুল ফিতর বিদায় নিয়েছে। সামনে আসছে ঈদুল আযহা। ঈদুল আযহার অন্যতম একটি ইবাদত হলো কোরবানি করা। যাদের সামার্থ্য আছে তাদের জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব। আর যাদের সামর্থ্য নাই, তারাও ইচ্ছা করলে কোরবানি দিতে পারবে।

কোরবানি শব্দটা মূলত আরবি ‘কুরব’ বা ‘কুরবান’ শব্দ থেকে নিগর্ত। যার অর্থ হল নৈকট্য লাভ, সান্নিধ্য। যে বস্তু কারো নৈকট্য লাভের উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেটাকে বলা হয় কোরবান। আর তা থেকেই কোরবানি। এছাড়া কোরবানিকে নাহার, নুসুক, আদহাও বলা হয়।

শরীয়াতের পরিভাষায় কোরবানি,
আল্লাহর সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট তারিখে বিধান মোতাবেক বিশেষ বিশেষ পশুকে আল্লাহর নামে যবেহ করাকে কোরবানি বলা হয়।

প্রত্যেক জাতির জন্য কোরবানির বিধান ছিল

আল্লাহ তায়ালা বলেন:
প্রত্যেক জাতির জন্য আমি কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি;যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরন করতে পারে, যে সমস্ত জন্তু তিনি রিযিক হিসেবে দিয়েছেন তার উপর। তোমাদের ইলাহ তো এক ইলাহ; অতএব তাঁরই কাছে আত্মসমপর্ণ করো। অনুগতদেরকে সুসংবাদ দাও। (সুরা হাজ্জ, আয়াত – ৩৪)

হযরত ইসমাইল (আ.) এর কোরবানির ইতিহাস:

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারীমে বলেন:
অতঃপর যখন সে (ঈসমাইল আ.) তাঁর (পিতার) সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো, তখন সে বলল, হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি, অতএব এ ব্যাপারে তোমার কি অভিমত? সে বলল, হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আমাকে ইনশাল্লাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। অতঃপর তাঁরা উভয়ে যখন আত্মসমপর্ণ করল এবং সে তাকে (ইসমাইল আ. কে) কাত করে শুইয়ে দিল, তখন আমি আহ্বান করে বললাম, হে ইবরাহীম, তুমি তো স্বপ্নকে সত্য পরিণত করেছ। নিশ্চয়ই আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আর আমি এক মহান (জান্নাতি দুম্বা) যবেহের বিনিময়ে তাকে মুক্ত করলাম। (সূরা সাফফাত, আয়াত ১০২-১০৭)

আত্মিক বিশুদ্ধতা আবশ্যক :

কোরবানি দেওয়ার আগে আমাদের আত্মিক বিশুদ্ধতা অর্জন করতে হবে। কেননা, তাক্বওয়া ব্যতীত আল্লাহ তায়ালার নিকট কোরবানি কবুল হবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন: আল্লাহ তায়ালার নিকট (কিন্তু) কখনো (কোরবানির) গোশত, রক্ত পৌছায় না, বরং তাঁর কাছে পৌছায় তোমাদের তাক্বওয়াটুকুই। (সূরা হাজ্ব, আয়াত ৩৭)
এই জন্য আমাদের জন্য আবশ্যক হলো কোরবানির আগে আমাদের নিয়ত বিশুদ্ধ করা। কোরবানি একমাত্র আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে দিতে হবে। লোক দেখানোর উদ্দেশ্য বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য দিলে আমাদের কোরবানি কবুল হবে না।

শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই কোরবানি দিতে হবে

আমাদের সমাজের অনেক ব্যক্তি আছেন যারা মানুষের চাপে পড়ে কোরবানি দিয়ে থাকেন। আবার কেউ লৌকিকতার জন্য কোরবানি দিয়ে থাকেন অথবা কেউ গোশত খাওয়ার আশায় বা আল্লাহর জন্য ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে। যারা এমনটা করে থাকেন তাদের কোরবানি আল্লাহ তায়ালার দরবারে কবুল হবে না।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
অতএব আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যেই সালাত আদায় করুন এবং কোরবানি করুন। (সূরা আল কাউসার, আয়াত-২)

অন্যত্রে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
(হে নবি) আপনি বলুন! অবশ্যই আমার সালাত, আমার কোরবানি,আমার জীবন, আমার মরণ সব কিছুই সৃষ্টিকুলের মালিক আল্লাহ তায়ালার জন্য।(সূরা আল আনআম,আয়াত-১৬২)।

তাই আমাদের কোরবানিও একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই দিতে হবে।

কোরবানির ফযিলাত :

হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম রাযি.থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাগণ রাযি. আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই কোরবানি কি? (অর্থাৎ কোরবানি কি শুধু আমাদের জন্য খাস নাকি পূর্বেও এর প্রচলন ছিলো?)

তখন তিনি বললেন: (এই কোরবানি) তোমাদের পিতা ইবরাহীম আ. এর সুন্নাত। সাহাবাগণ রাযি. পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
এতে কোনো সওয়াব আছে নাকি?
তিনি বললেন: কোরবানির জন্তুর প্রত্যেকটি পশমের বিনিময়ে একটি করে সওয়াব রয়েছে। সাহাবাগণ পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন,
ইয়া রাসূলাল্লাহ! যে সমস্ত জন্তুর পশম গুচ্ছাকারে থাকে (যথা ভেড়া) সেখানে কি এক একটি গুচ্ছ পশম হিসেবে গণ্য হবে?
তিনি বললেন: প্রতিটি পশমের পরিবর্তে একটি সওয়াব পাবে। ( ইবনে মাজাহ, আহমাদ,মিশকাত পৃষ্ঠা নং-১২৯)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
কোরবানির ঈদের দিনে অন্য কোনো আমল কোরবানি করা অপেক্ষা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় নয়।(তিরমিযি শরিফ)

সামার্থ্যবান ব্যক্তি কোরবানি না দিলে ঈদগাহে যাওয়া নিষেধ

হযরত আবু হুরায়রা রাযি.থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোরবানি করার সামার্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করল না। সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে। (ইবনে মাজাহ-৩১২৩)

তাই আসুন!
কোরবানি দেওয়ার আগে আমাদের নিয়তকে বিশুদ্ধ করতে হবে। কোরবানি একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই দিতে হবে। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের নিয়তকে বিশুদ্ধ করে কোরবানি দিয়ে তাঁর নৈকট্য লাভের তৌফিক দিন। (আমীন)।

লেখক : মুহাঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন, ঝিনাইদহ

এ জাতীয় আরো সংবাদ