আজ বৃহস্পতিবার,৯ই আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,২৪শে সেপ্টেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,রাত ১১:৩১

আমরা সবাই আবার হব আমাদের

Print This Post Print This Post

এক.
ইংরেজিতে একটা কথা আছে, “A gentleman is what his tailor makes of him.” দর্জি যদি ভদ্রলোক তৈরি করতে পারেন, তা’হলে একটি দেশও তৈরি সাধারণ মানুষের হাতে, অতি মানবের হাতে নয়।

দুই.

যদি প্রাণে বেঁচে যাই, যদি দেখি নতুন সূর্যোদয়,
ঊষার আলোর রাঙা রথে চড়ে করবো বিশ্বজয়।

যদি প্রাণে বেঁচে যাই, যদি শুনি বাজে জয়ডংকা,
জাগিবে পৃথিবী নব নব রূপে, নেই কোনো শংকা।

যদি বেঁচে থাকি, বলি-কেটে গেছে করোনা আঁধার,
মৃত্যুর মিছিল শেষে পার হবো পর্বত বাধার।

যদি প্রাণে বেঁচে যাই, যদি নিই বুক ভরা শ্বাস,
প্রতিটি মুহূর্ত গুণে মানুষেরে করেছি বিশ্বাস।

যদি বেঁচে থাকি, কানে যদি আসে পাখিদের গান,
সবাই থাকুক সুখে পৃথিবীর আছে যত প্রাণ।

তিন.
মানুষের উপলব্ধি। গবেষণালব্ধ ফল ও স্রষ্টার দয়ায় আমরা যদি করোনার আজাব থেকে মুক্তি পাই ; তখন আমরা কী করবো ? আমরা কি আবার আগের সভ্যতায় ফিরে যাবো ? জুলুম। নিপীড়ন। অন্যায়। অবিচার। ভোগ। বিলাস। অনাচার। অশ্লীলতা। যুদ্ধবিগ্রহ। ধর্ম-বর্ণ বিদ্বেষের পালে আবার নতুন করে বাতাস দেবো ? অনাকাঙ্খিত এমন সভ্যতাইতো আমরা ছিলাম।

এই সভ্যতায় পৃথিবীতো ধ্বংসের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছিল। পৃথিবী মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। ভাবতে কি অবাক লাগেনা ? যারা পৃথিবী শাসন করছিল তাদের প্রধান কাজই ছিল অস্ত্র ব্যবসা।
যুদ্ধ ছাড়াতো তাদের অস্ত্র ব্যবসা অচল। তাই প্রয়োজন ছিল নতুন নতুন যুদ্ধক্ষেত্র।

ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়ায় সেই যুদ্ধ লক্ষ্য করেছি। ফিলিস্তিন আরো বড় ও নির্মম উদাহরণ।
এই সভ্যতার বড় প্রহসন হলো, যারা অস্ত্র বিক্রি করে, তারাই আবার শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব দেয়। ফলে যুদ্ধ আর থামে না। যে সভ্যতায় আমরা বসবাস করছিলাম তা কোনো সভ্যতাই ছিল না। ছিল সভ্যতার নামে এক প্রহসন। ভাগ-বাটোয়ারা ও চাতুর্যের ওই সভ্যতায় আমাদের প্রিয় পৃথিবীর বারটা বেজে গিয়েছিল।

চার .
দাম্ভিক শাসকরাতো অস্ত্র ব্যবসায় মশগুল। পরিবেশ রক্ষায় তাদের মনোযোগ ছিলনা। অনেকে ছিলেন বৈরি ভূমিকায়। আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স সৃষ্টি করে মানুষকে বেকারত্বের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
শুধু অস্থিরতা নয়, সৃষ্টি হয়েছে নানা হুমকিও। পৃথিবী জুড়ে সম্পদ কেন্দ্রীভুত। কিছু দেশে। কিছু মানুষের হাতে।

যে লক্ষ্যে মানুষ পৃথিবীতে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করেছিল সেখানে পৌঁছতে পারেনি। আওয়াজ তুলতে হবে জলবায়ু রক্ষায়। আওয়াজ তুলতে হবে যুদ্ধ বন্ধের। বিজ্ঞানের দানবীয় ব্যবহারে মানুষকে বেকার করা যাবে না। মানবিক বিশ্বে বর্ণ ও ধর্ম-বিদ্বেষ চলতে
দেয়া যায় কী ?

পাঁচ.
বিশুদ্ধ বাতাস। স্বচ্ছ ও নিরাপদ পানীয় জল। পর্যাপ্ত খাদ্য। নিরাপদ বাসস্থান। স্বাস্থ্য সম্পদের এই মৌলিক চাহিদাগুলোকে প্রভাবিত করছে জলবায়ু পরিবর্তন।
বছরে অতিরিক্ত প্রায় দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে শুধু বিশ্ব-উষ্ণায়নের ফলে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত ও সংবেদনশীল স্বাস্থ্যসমস্যা অপুষ্টি, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া। ভয়াবহ আকার নিতে চলেছে ডেঙ্গু ।

পৃথিবীর যেসব অঞ্চলে ভৌগোলিক কারণে এগুলোর প্রকোপ ছিল না বা কম ছিল, জলবায়ু পরিবর্তনে সেই অঞ্চলগুলোতে ভৌগোলিক সীমারেখা মুছে নতুন স্বাস্থ্যসমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। দুর্বল স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এই সমস্যার আকস্মিকতা ও ব্যাপ্তি সামলানোর পক্ষে যথেষ্ট নয়। শুধু রোগের বিরুদ্ধে লড়াই, পরিবেশকে শীতল ও নির্মল করার সব উদ্যোগের পাশাপাশি, উন্নততর যাতায়াত, খাদ্য ও জ্বালানি ব্যবহার স্বাস্থ্যসমস্যার এই নতুন দিকটিকে অনেকটা সামাল দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্তত এমনটাই একটি প্রতিবেদনে জানাচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। কিন্তু সমস্যার মূলে যে জলবায়ু পরিবর্তন সেটা কীভাবে সম্ভব হলো?

৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষের পরিবেশবিরোধী নানারকম ক্রিয়াকলাপের ব্যাপক বৃদ্ধি, কয়লা। পেট্রোলিয়াম। জীবাশ্ম জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। বায়ুম-লে কার্বন-ডাই অক্সাইড। ক্লোরোফ্লুরো কার্বন। মিথেন। ওজোন। নাইট্রাস অক্সাইড ‘গ্রিনহাউস গ্যাসের উপস্থিতি বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে বায়ুম-লের নিচের স্তরে উষ্ণতা বেড়ে গিয়ে তা প্রভাবিত করছে পৃথিবীর জলবায়ুকে।

ছয়.
জীবনের শেষ পরিণতি মৃত্যু। একটু জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই কথাটা বুঝতে শিখেছি। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়টাই এক জীবন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখে গেলাম, মানুষ কতটা অসহায়। পৃথিবীকে এমন একটা হোঁচট খেতে দেখে খুব কষ্ট হচ্ছে। কীভাবে,কতদিন পরে আমার মৃত্যু হবে তা জানি না; তবে মৃত্যুর আগে কিছুটা দুর্বিষহ জীবন নিয়ে গেলাম।

সাত.
যেদিন পদ্মা সেতু দিয়ে প্রথম মানুষ চলাচল শুরু হবে, সেদিন ওই সেতুর ওপর দিয়ে চলে যাব মধুমতির পারে, বাঁশঝাড়ের পাশে আম-জাম-সুপারি বাগানের ছায়ায় ঘেরা গ্রামে। যেখানে পাখির কিচিরমিচির ডাকে এখনও ঘুম ভাঙে। যেখানে এখনও টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার শব্দ শোনা যায়।

জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে অনুভব করে গেলাম, সমাজবিচ্যুত হয়ে বেঁচে আছি। পবিত্র ঈদেও কোনো প্রিয়জন কাছে আসেনি। পারিনি কোথাও কোনো সতীর্থ অথবা প্রিয়জনের কাছে যেতে। সামনের দিনগুলোর জন্য নেই পরিকল্পনা, নেই কোনো স্বপ্ন। একজন হেডমাস্টার অথবা সরকারি, আধা-সরকারি কর্মচারীর মতো কর্মক্ষম সুস্থ থাকা সত্ত্বেও একগুচ্ছ ফুল, একটা ছাতা, একটা লাঠি আর চোখের জল নিয়ে কর্মস্থল থেকে বিদায় নিতে হবে না। বারবার মনে হয়, বোধহয় সুস্থভাবে বেঁচে থেকেও সিনেমার শেষ টাইটেল প্লেটের মতো হয়ে গেলাম ‘দ্য এন্ড’।
তবুও অনেক আশা, প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর অন্ধকার পেরিয়ে যেমন নতুন সকাল হয়, তেমিন আবার সকাল হবে। সেই সকালে খবর পাব, শতভাগ সাফল্য নিয়ে নতুন ওষুধ আবিষ্কৃত হয়েছে।
খবর পাব, শতভাগ সাফল্য নিয়ে এখন ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে। আবার আমরা সবাই চলে যাব আমাদের কর্মস্থলে।

না, ‘দ্য এন্ড’ নয়; আবার শুটিং হবে, আবার হবে অ্যাকশন-কাট। সেই সকালে ঈদের দিনের মতো আবার বুকে বুক মিলিয়ে হবে কোলাকুলি। মুখে মাস্ক নয়, সামাজিক দূরত্ব নয়; আমরা সবাই আবার হব আমাদের…।

লেখক : এম এ কবীর, সাংবাদিক
কলামিস্ট, গবেষক, সমাজ চিন্তক।

এ জাতীয় আরো সংবাদ