আজ শুক্রবার,২৩শে শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,৭ই আগস্ট ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,রাত ৩:২৫

এই চলার পথের শেষ কোথায় তা কেউ জানে না!

Print This Post Print This Post

নারকেলের কাছে তো নারকেলই চাইবো ? ডাবের কাছে ডাব। এমন তো নয়, নারকেলের কাছে-নারকেল এবং ডাব দুটোই চাইবো। যদিও একই জিনিস। সময়ের প্রবাহে ডাব থেকে নারকেল হয়। আবার অকালে পতিত ডাব-না হয় নারকেল না হয় ডাব ।
এই জগত। এই জীবন। অতি সংক্ষিপ্ত। আছে দুঃখ। কষ্ট। সুখ। শান্তি। আশা। ভরসা। সফলতা। বিফলতা।
অপূূর্ণতাকে নিয়ে আছে অভিযোগ। আছে ক্ষোভ। জীবন যাপনের অনন্ত আশা-আকাঙ্খা নিয়ে যাদের আফসোস তারা কোনোদিন তা পরিপূর্ণ করতে পারে না। পরিতৃপ্ত হতে পারে না। কঠোর পরিশ্রম করে সফল হলে বলতেই হয়, তা সৃষ্টিকর্তারই নিয়ামত।
সুখ-শান্তির প্রত্যাশা, মানুষের সহজাত প্রবণতার একেবারেই ভিন্ন দিক। জোর জবরদস্তি করে কখনোই আদায় করা যায় না।

দেহ এবং মনের প্রয়োজন সমানভাবে পূরণ করতে পারলে মানুষ পেতে পারে সুখের সন্ধান। তার জন্য মানুষের বিজ্ঞতার আলোকেই পরিশ্রম করা দরকার। সারা পৃথিবীতে এমন কাউকেই পাওয়া যাবে না, তারা সুখী হতে চায় না। যার যার নিজস্ব চিন্তাতেই সুখী হতে চায়। অনেকে ভাবে অর্থকড়ি, শিক্ষা-দীক্ষা, বিবাহ, সন্তান-সন্ততি, পরিবার, সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি মানুষকে অনেক ‘সুখী’ করতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জরিপ করে দেখা গেছে, এ সকল অর্জন মানব জাতিকে সুখী করতে পারে না। লাখ লাখ মানুষের জন্যেই প্রকৃত সুখ হয়ে যায় সোনার হরিণ। দুনিয়া খুব সুন্দর। তাকে উপভোগ করার স্বাধীনতা মানুষের আছে। দুনিয়াকে যেমনি মানুষ পেয়েছে তেমনি সুখ লাভের প্রকৃৃত পন্থাও রেখেছেন মহান সৃষ্টিকর্তা।

মানুষের আনন্দ, ভোগ-বিলাস. সৌন্দর্য উপভোগে আল্লাহ তায়া’লার পক্ষ থেকে আছে প্রতিদান।
দুনিয়া আখেরাতের সাথেই সম্পৃক্ত। দৈহিক ও শারীরিক আনন্দ উপভোগ করা অন্তরের আনন্দের সাথে যুক্ত। ভোগের মাধ্যমে অর্জিত সুখ-শান্তি মানুষের অভ্যন্তরীণ পরিতুষ্টি – প্রশান্তির সাথে সম্পৃক্ত। অনেকে ভাবেন ‘সুখ’ হয়তো গাড়ি, বাড়ি, অলঙ্কার, কাপড় চোপড় অথবা ধন-দৌলতের মধ্যে আছে। সমাজ বিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী, চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মনে করেন এগুলো মানুষকে সাময়িক কিছুটা সুখ দিতে পারে। স্থায়ী সুখ প্রাপ্তির জন্য এধরণের চাহিদা বড় ভূমিকা পালন করে না।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সুখ বৈষয়িক বা জাগতিক কোনো ব্যাপার নয়। ‘সুখ’ হল বহুলাংশে মনস্তাত্ত্বিক – আধ্যাত্মিক ব্যাপার।

সুখপ্রাপ্তির জন্য কোনো ‘শর্টকাট পদ্ধতি নেই। রাস্তাও নেই। সবচেয়ে সুখী মানুষ দিনের চব্বিশ ঘণ্টা-ই সুখী থাকেনা । তাদের জীবনেও আছে- হতাশা। আছে দুঃখ। কষ্ট। পার্থক্য হলো সুখী মানুষ হতাশা, দুঃখ,কষ্টকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে। অন্যরা তা পারেন না। মানব শরীরটা শুধুই রক্ত-মাংসে গড়া কোনো জড়বস্তু নয়। আছে আত্মা যা কিনা শরীরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আবেগ-অনুভূতিই শরীরের ওপর প্রচন্ড প্রভাব ফেলে। বস্তু জগতে কাম, ক্রোধ, লোভ-লালসা, মোহ, মাৎসর্য, ঈর্ষা, প্রতিহিংসা মানুষের দুঃখ, কষ্ট, অশান্তি, অসুখ এবং ধ্বংসের মূলকারণ। মানুষ তার সততা, সৎ কর্ম বা অটলসৃষ্টিকর্তাপ্রীতি দ্বারা বদগুণ থেকে নিজকে দূরে রাখে। পার্থিব জীবনে পরম স্বর্গসুখ লাভ করতে পারে।
একসময়ে মনে হতো সুখের চেয়ে শান্তি ভালো। সেই সময়েই মানুষ, সুখ আর শান্তিকে কখনো এক করে দেখতে চায়নি। এখন মনে হয় শান্তি ছাড়া সুখ ভোগ সম্ভব নয়।

সুখ ছাড়া জীবনে ‘শান্তি’ আসতে পারে না। “সুখ আর শান্তি” দুটোই আলাদা শব্দ। অর্থের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। বাস্তবে ”সুখ বা শান্তি” চলে একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে। সুখ শব্দটি মানুষের দেহনির্ভর। আর শান্তি শব্দটি সেই মানুষের মননির্ভর। বাস্তবে শরীরের অস্তিত্বকে বাদ দিয়ে- মনের অস্তিত্বের কথা ভাবা খুবই কঠিন। সারাজীবন মানুুষ বাঁচে নিজ শরীর নিয়ে। মৃত্যুতে শরীরের কোনো প্রয়োজন থাকে না। ফুরায় সুখ-দুঃখের অনুভব। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সুখ হলো জেনেটিক বা বংশানুগতিসম্বন্ধীয়। আবার বেশকিছু বিজ্ঞানী তাদের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সূত্র ধরে বলেন, তারা মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশ নির্ণয় করেছেন, যেখান থেকে ‘সুখ নিঃসৃত’ হয়। স্কাউটের জনক রবার্টস্টিফেনসন স্মিথ লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল অব গিলওয়েল বলেছেন– “সুখ লাভের প্রকৃত পন্থা হলো অপরকে সুখী করা”। সুন্দর পৃথিবীটাকে যেমন পেয়েছো তার চেয়ে একটু শ্রেষ্ঠতর কিছু রেখে যাওয়ার চেষ্টা করো, তোমাদের মৃত্যুর পালা যখন আসবে তখন সানন্দে এই অনুভুতি নিয়ে ‘মৃত্য বরন’ করতে পারবে।

তুমি অন্তত জীবন নষ্ট করনি কিংবা সাধ্য মতই সদ্ব্যবহার করেছ। তাই এমন ভাবেই সুখে বাঁচতে ও সুখে মরতে প্রস্তুত থাকা প্রতিটি মানুষেরই উচিত।
হিং¯্রতাকে পরিত্যাগ করতে না পারলে মানব জাতি কখনোই পেতে পারে না ‘শান্তি’। মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতই দুঃখের বড় কারণ। হার্ভার্ডের মনোবিজ্ঞানী ড্যান গিলবার্ট বলেছেন, নিজস্ব সুখ নিজেকেই সংশ্লেষণ করতে হবে। শরীরে মনস্তাত্ত্বিক একটি ইম্মিউন সিস্টেম রয়েছে যা কিনা তোমার পারিপার্শ্বিকতা বা তোমার বিশ্বকেই জানতে ও বুঝতে সাহায্য করার মাধ্যমে তোমাকে সুখী করে তুলবে। নতুন নতুন কাপড়-চোপড় ক্রয় করা কিংবা ‘লটারির অগাধ টাকা’ অর্জনে তোমার জীবনের সব দুঃখ দূর করে অনাবিল আনন্দ ও সুখ বয়ে আনবে, এই ধরনের কল্পনা মানুষের চিন্তা শক্তিকে ভুল পথে পরিচালিত করে।

‘মিশিগানের হোপ’ কলেজের সাইকোলজি বিভাগের প্রফেসর ডেভিড মায়ারের উক্তিমতে, জেনেটিক বা বংশানুগতি সম্বন্ধীয় তত্ত্বের ভিত্তিতে- যে যাই বলেথাকুক না কেন, মানুষের সুখ অনেকাংশেই ‘নিজস্ব নিয়ন্ত্রণাধীন একটি অনুভূতি’। এ ‘সুখ’ অনেকটা মানুষের কোলেস্টেরল লেভেলের মতো, যা জেনেটিক্যালি প্রভাবান্বিত, আবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যেন মানুষের আচার-আচরণ বা লাইফ স্টাইল ও খাদ্যাভ্যাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

জানা দরকার, সুখের বিপরীত শব্দটা হলো অসুখ। যে সুখী নয় সে সুস্থও নয়। অসুখ হতে পারে শারীরিক বা মানসিক। শারীরিক অসুস্থতায় ভুগলেও মানুষের জীবনে ‘সুখ’ থাকে না। তবুও ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে- শারীরিক অসুস্থতা বহুলাংশেই সারানো যায়। মানুষ যদি মানসিক অসুস্থতার শিকার হয়, তখন জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। কারণ, মানসিকরোগ পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল রোগ।

সুখকে মাঝে মাঝেই এক ধরনের স্বার্থিক উদ্দেশ্য মনে করা হয়। মানুষের কী আছে- তার ওপর সুখ নির্ভর করে না। মানুষ কী ভাবে তার ওপর সম্পূর্ণ সুখ নির্ভর করে। যার যা আছে, যে অবস্থায় আছে, তার জন্যেই শুকরিয়া জানিয়ে যদি দিন শুরু করা হয়- তাতে সুখ আসবে।

মানুষ যখন যা ভাবছে তার ওপর ভিত্তি করেই- তার ভবিষ্যতের সুখ আসতে পারে। কাজ-কর্ম, চিন্তায় পজিটিভ অ্যাপ্রোচ নিয়ে জীবনটা শুরু করলে সুফল আসবে। সুখী হবে। আত্মবিশ্বাসী। জ্ঞানী। গুণী। মর্যাদাবান। হৃদয়বান। সৎ মানুষ সব সময় সুখী হয়। যারা শুধু নিতে চায়। দিতে জানে না। দিতে চায় না, তারা সুখী হয় না। মহান সৃষ্টিকর্তার ওপর যার বিশ্বাস যত দৃঢ় হয়, এই বস্তু জগতে তিনিই তত সুখী। ‘সুস্থ, সুন্দর এবং সুখী’ জীবনযাপনের জন্য প্রকৃতিতে রয়েছে হাজার নিয়ামত।

জ্ঞান-বিজ্ঞান। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন,বিশ্বাস প্রক্রিয়ায় ‘প্রাকৃতিক জীবন’ থেকে সরে এসে কৃত্রিম, অসুস্থ, ক্ষতিকর, অসুখী জীবনধারণের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে মানুষ। প্রাকৃতিক জীবনযাত্রা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে লাখো-কোটি মানুষের শরীর, মন কিংবা আত্মার ওপর প্রচন্ড নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই প্রাকৃতিক উপায় অবলম্বন করার মাধ্যমেই- মানুষ অতি সহজে সুস্থ, সুন্দর ও সুখী জীবনের অধিকারী হতে পারে। পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় ধনীদের মধ্যে অন্যতম যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ারেন বাফেট। তাঁর কাজ-কর্ম, টাকা-পয়সা, সুখ-শান্তি বা জীবনদর্শনের অনেক গল্প প্রচলিত থাকলেও কিছুটা জানি। কিছুটা জানি না।
‘ওয়ারেন বাফেট’ কোনো সময়ে ব্যক্তিগত বিমানে চড়েননি। তিনিই বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মালিকানার একটি জেট কোম্পানির মালিক।

পঞ্চাশ বছর আগে কেনা ৩ কক্ষ বিশিষ্ট একটি বাড়িতে বসবাস করেন। অনলাইন ব্রিজ খেলে অপরিসীম ‘আনন্দ লাভ ও সুখ ভোগ করে থাকেন।
অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি। অনুপ্রেরণাদায়ক। বিশাল ধন সম্পদের মালিক পরম সুখী ওয়ারেন বাফেট মনে করেন, ধন-দৌলত নয়, মনের সুখই আসল সুখ। অন্যকে সুখী করবার মধ্যেও “প্রকৃত সুখ” রয়েছে।
‘কর্মহীন জীবন’ হতাশার কাফনে জড়ানো একটি জীবন্ত লাশ। ভাগ্যনির্ভর জুয়া খেলার অনিশ্চিত জীবন, সংগ্রামী মানুষদের জন্য নয়। মানুষ যখন হাত-পা-মাথাবিহীন, জ্ঞান-বুদ্ধিহীন ক্ষুদ্র শুক্রাণু ছিল তখন ৩০ কোটির অধিককে পেছনে ফেলে দৌড়ে বিজয় অর্জন করে হতে হয়েছে। বিন্দু হতে সিন্ধু হয়ে আবার অণুতে বিলীন হয় মানুষ, থাকে শুধু লেখা, কথা ও কাজ। জন্মসূত্রই বলে দেয়
সু-কর্মময় গতিই জীবন…

মানুষ তার জিনগত মৌলিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে পারেনা। পারেনা ভাগ্যের লিখন খন্ডাতে। নেতিবাচক বিষয় নিয়ন্ত্রণ ও ইতিবাচকে বিকশিত করতে পারে। তাই ‘জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো’ এই আশায় জীবন বাজি রেখে ভালো কাজের সন্ধানে, জন্ম–জন্মান্তর স্রোতের উল্টো দিকে সাঁতার কাটা…। এই চলার পথের শেষ কোথায় তা কেউ জানে না।

লেখক : এম এ কবীর সাংবাদিক। কলামিস্ট, গবেষক, সমাজ চিন্তক।

এ জাতীয় আরো সংবাদ