আজ শুক্রবার,২৩শে শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,৭ই আগস্ট ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,রাত ৩:১৪

কর্মের মাধ্যমেই মানুষের পরিণতি নির্ধারিত

Print This Post Print This Post

কর্মের মাধ্যমেই মানুষের পরিণতি নির্ধারিত। দুনিয়া ও আখেরাতের সুখ-শান্তি সফলতা-ব্যর্থতা কর্মের ওপরই নির্ভরশীল। সৎ কর্মশীলদের জীবন হয় আলোকিত, সফল। অলস, অসৎ কর্মশীলদের জীবন হয় অন্ধকারাচ্ছন্ন, ব্যর্থ। পার্থিব জীবনের উন্নতি। পারলৌকিক কল্যাণ কামনায় কাজের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম কাজের প্রতি সীমাহীন গুরুত্বারোপ করেছে। কর্মহীন অলস জীবনযাপনকে পাপ বলে গণ্য করেছে।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে :

নিশ্চয় মানুষ তা-ই পায়। যা সে করে। অচিরেই তার কর্ম মূল্যায়ন করা হবে। তারপর তাকে পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করা হবে। (সূরা নাজম, আয়াত ৩৯-৪১)।
পবিত্র কোরআনে আরো বলা হয়েছে-অতঃপর যখন নামাজ সমাপ্ত হবে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়। আল্লাহর অনুগ্রহ (রিজিক) অনুসন্ধান কর। আল্লাহতায়ালাকে অধিক স্মরণ কর। যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (সূরা জুমুআ, আয়াত ১০)।

কাজের প্রতি গুরুত্বারোপ করে মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, নিজ হাতে উপার্জনের চেয়ে উত্তম কোনো উপার্জন নেই। হজরত দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। (বুখারি)।


প্রিয়নবী (সা.) আরও ইরশাদ করেন,
হালাল রুজি উপার্জন করা ফরজের পর একটি ফরজ। (বুখারি ও মুসলিম)। রসুলুল্লাহ (সা.) নিজ পরিশ্রমের উপার্জনকে সর্বোত্তম উপার্জন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাই অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে নয়, বরং নিজ মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে হালাল রুজি অর্জনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করাই হলো ইসলামের অনুপম শিক্ষা।

পূর্ববর্তী সব নবী-রসুলগণও পরিশ্রম করে স্বহস্তে জীবিকা উপার্জন করতেন।হজরত আদম (আ.)। হজরত শীষ (আ.) ও হজরত ইউনুস (আ.) চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। হজরত ইদরিস (আ.)-এর পেশা ছিল কাপড় সেলাই করা। হজরত নুহ (আ.) ও হজরত জাকারিয়া (আ.) ছিলেন কাঠমিস্ত্রি।
মহাপ্লাবনের সময় হজরত নুহ (আ.) মহান আল্লাহর নির্দেশে সুবিশাল একটি নৌকা তৈরি করেছিলেন; যা ৩০০ হাত দীর্ঘ, ৫০ হাত প্রস্থ ও ৩০ হাত উচ্চতাসম্পন্ন ছিল।

হজরত দাউদ (আ.) রাজ্যের বাদশাহ হওয়া সত্ত্বেও নিজে লৌহবর্ম বানিয়ে বিক্রয় করে জীবিকা উপার্জন করতেন এবং তার ছেলে হজরত সোলাইমান (আ.) সমগ্র পৃথিবীর বাদশাহ ছিলেন। হজরত ইবরাহীম (আ.) ও হজরত ইসমাঈল (আ.) এর পেশা ছিল ব্যবসা ও রাজমিস্ত্রি। তারা উভয়ে মহান আল্লাহর নির্দেশে পবিত্র কাবাঘর নির্মাণ করেন। হজরত ইউসুফ (আ.) রাজ্যের মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতেন। এ ছাড়াও হজরত সালেহ (আ.), ইয়াকুব (আ.), শোয়াইব (আ.), হজরত ইলিয়াস (আ.), হজরত মুসা (আ.) ও হজরত হারুন (আ.) পশু পালন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। আর আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন বিচক্ষণ সৎ ও সফল ব্যবসায়ী। ঘর ঝাড়ু, কাপড় সেলাই, বকরির দুগ্ধ ােহনসহ ঘরের যাবতীয় কাজেও তিনি স্ত্রীগণকে সহযোগিতা করতেন।

পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত- ‘কুল্লুনাফসিন জায়েকাতুল মাউত’।- সব প্রাণীকে এক দিন মৃত্যুস্বাদ পেতে হবে। মানুষসহ সব প্রাণীর জন্য মৃত্যু এক অনিবার্য সত্য। কারোর পক্ষে মৃত্যুকে এড়ানো সম্ভব নয়।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- মরণরে তুঁহ মম শ্যাম সমান। মৃত্যুকে যত মহিমান্বিতভাবে দেখা হোক না কেন আসল সত্যি হলো কারও কাছেই তা কাম্য নয়। সুন্দর এ পৃথিবী থেকে কেউ চলে যেতে চায় না। তবু যেতে হয়-এটাই বাস্তবতা।

জীবনের প্রতি মানুষের রয়েছে গভীর মমত্ববোধ। এ মমত্ববোধের কারণেই মানুষ মৃত্যুকে এড়িয়ে চলতে চায়। দুঃখ। হতাশা। লজ্জা। ক্ষোভে মানুষ কখনো কখনো আত্মঘাতী হলেও সেটি তার স্বাভাবিক প্রবণতা নয়।

মানুষ বেঁচে থাকতে চায় চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও। মৃত্যুকে ভয় করলেও কখনো কখনো নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও মানুষ এগিয়ে যায় কর্তব্য পালনে।
যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের বেলায় এটি অহরহই ঘটে। আত্মসমর্পণের বদলে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দেয়ার নিয়ম ভারতে রাজপুতদের মধ্যে বহুকাল ধরেই প্রচলিত ছিল।

আপত্য স্নেহের কাছে নিজের জীবনও যে তুচ্ছ, এ প্রমাণ রেখেছেন মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর। পুত্র হুমায়ুন তখন রোগ শয্যায়। চিকিৎসকরা জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছেন। সম্রাট বাবর পুত্রের জীবন ভিক্ষায় আল্লাহর দরবারে হাত পাতলেন। বললেন, হে আল্লাহ তুমি আমার জীবনের বিনিময়ে পুত্রের রোগ নিরাময় কর। বলা হয়, বাবরের এই দোয়া কবুল হয়েছিল। সেদিন থেকেই হুমায়ুন দ্রুত আরোগ্য লাভ করতে থাকেন। পক্ষান্তরে সম্রাট বাবর রোগশয্যায় শায়িত হন। সে রোগশয্যাতেই পতিত হন মৃত্যুমুখে।

মৃত্যুকে তুচ্ছ করার এমন নজির ভূরি ভূরি। ধরা যাক সক্রেটিসের কথা। মিথ্যা অভিযোগে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। প্রহসনের বিচারে রায় হয়, হেমলেক পানে তাকে মরতে হবে। হাতে তুলে দেয়া হয় বিষের পেয়ালা। সক্রেটিসের শিষ্যরা গুরুর হাতে বিষের পেয়ালা দেখে কেঁদে ওঠেন। তারা বলেন, শেষ পর্যন্ত মিথ্যা অভিযোগে আপনাকে মরতে হচ্ছে। সক্রেটিস হাসলেন। বলেন বৎস, তোমরা কি চাও অন্যায় করে আমি মৃত্যুবরণ করি? খ্রিস্ট ধর্মের প্রবর্তক যিশুর মৃত্যু হয় ক্রুশবিদ্ধ হয়ে। ইহুদিদের ষড়যন্ত্রে তাকে ক্রুশে ঝুলানো হয়। যিশু অনুতাপহীনভাবে বরণ করে নেন সেই মৃত্যু। ক্রুশে বিদ্ধ হওয়ার পর তিনি প্রার্থনা করেন। বলেন, ঈশ্বর ওদের ক্ষমা কর। ওরা জানে না কী করছে?

মৃত্যু সম্পর্কে চীনা নেতা মাও সেতুংয়ের মূল্যায়ন মনে রাখার মতো। তিনি বলেছেন, কোনো কোনো মৃত্যু থাই পাহাড়ের মতো ভারী। কোনো কোনো মৃত্যু হাঁসের পালকের মতো তুচ্ছ। থাই পাহাড়ের মতো ভারী মৃত্যু বলতে মাও কী বুঝিয়েছেন ? মৃত্যু কি কখনো পাহাড়ের মতো ভারী হতে পারে ? মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, পারে। যে মৃত্যু মানুষকে কাঁদায়, যার মৃত্যু মানুষের হৃদয়ে শূন্যতার সৃষ্টি করে, যে মৃত্যু দেশ ও জাতির কল্যাণে, সে মৃত্যু অবশ্যই পাহাড়ের মতো ভারী। এমন মৃত্যু বরণ করা অহংকারের বিষয় বলেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছে।

রোমান বীর জুলিয়াস সিজার মৃত্যুবরণ করেন অপঘাতে। সিজারের বন্ধু ও সভাসদ ছিলেন বরুটাস। তাকে তিনি বিশ্বাস করতেন। আপন লোক হিসেবেই জানতেন। বরুটাসের ছুরিকাঘাতেই নিহত হন এই রোমান বীর। মৃত্যুকালে সিজারের শেষ উচ্চারণ ছিল-বরুটাস তুমিও।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুও ঘটেছে এক বিশ্বাসঘাতকের হাতে। ইন্দিরার আমলে পাঞ্জাবের অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযান চালানো হয়। এ ঘটনা শিখদের ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত হানে। চরমপন্থি শিখরা ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করে বদলা নেয়ার প্রতিজ্ঞা করে।

তাদের এ জিঘাংসা গোপন ছিল না। ইন্দিরাকে বলা হয় শিখদের সম্পর্কে সতর্ক হতে। কিন্তু তিনি ছিলেন অসীম সাহসের প্রতিমূর্তি। একবার এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন-শিখ চরমপন্থিরা তো আপনার জীবনহানির হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে? ইন্দিরার বক্তব্য ছিল, তারা তা পারবে না। শিখ দেহরক্ষীদের দেখিয়ে তিনি জবাব দিয়েছিলেন- ওরাই তা হতে দেবে না। অদৃষ্টের কী পরিহাস, যে শিখ দেহরক্ষীদের তিনি এত বেশি বিশ্বাস করতেন-তাদের হাতেই ইন্দিরা গান্ধীকে প্রাণ দিতে হয়।

পবিত্র কোরআনে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি করা হয়েছে। বলা হয়েছে যারা ষড়যন্ত্র করে আল্লাহ তাদের প্রতিহত করেন। মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বৈরাম খান এক অনন্য নাম। হুমায়ুনের মৃত্যুর পর আকবর যখন সিংহাসনে বসেন, তখন তিনি ছোট বালক। শত্রুর চ্যালেঞ্জের মুখে মোগলদের অস্তিত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন। বৈরাম ছিলেন বাদশাহ হুমায়ুনের বিশ্বস্ত বন্ধু। বিপদের দিনের পরীক্ষিত সাথী। বৈরাম খানকে কিশোর সম্রাটের অভিভাবক মনোনয়ন করা হয়। আকবর তাকে ডাকতেন ‘খান বাবা’ বলে। বৈরাম খানের চেষ্টায় মোগল সাম্রাজ্য বিপদমুক্ত হয়।

একের পর এক রাজ্য মোগলদের আনুগত্য স্বীকার করে। বয়ঃপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে আকবর রাজদন্ড হাতে নেন। তখনো তিনি বৈরাম খানকে অসীম শ্রদ্ধা করতেন। এটিই বৈরামের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। শুরু হয় ষড়যন্ত্র। আকবরের মন বিষিয়ে তোলার চেষ্টা চলে। একপর্যায়ে দুঃখ ক্ষোভে বৈরাম খান আকবরকে ছেড়ে যেতে চান।

তাকে গ্রেফতার করা হয়। শুধু গ্রেফতার নয়, ষড়যন্ত্রকারীদের কুমন্ত্রণায় বৈরাম খানকে অন্ধ করে দেয়া হয়। তবে দয়া করে রাজকীয় ব্যবস্থায় তাকে হজে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। বৈরাম খানের ইচ্ছা ছিল, শেষ জীবনটা তিনি পবিত্র মক্কায় কাটাবেন। কিন্তু সে ইচ্ছা পূরণ হলো না। হজে যাওয়ার পথে ঘাতকদের হাতে প্রাণ হারান এই মোগল বীর।


জীবনের চেয়েও কি টাকার মূল্য বেশি? স্থূলবুদ্ধির লোকজনের কাছে তা হতেও পারে। তুরস্কের নামি কুস্তিগির ছিলেন ইউসুফ ইসমাইল। ১৮৯৮ সালে তিনি আমেরিকায় যান। সে দেশের চ্যাম্পিয়ন কুস্তিগির আইভান লুইসকে হারিয়ে লাভ করেন বিপুল অর্থ। ইসমাইল সেগুলো স্বর্ণমুদ্রায় রূপান্তরিত করেন।আমেরিকা থেকে জাহাজে করে দেশে ফেরার পথে কোমরের বেল্টের সঙ্গে বাঁধা ছিল এই স্বর্ণমুদ্রা। সমুদ্রপথে আরেকটি জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ইউসুফদের জাহাজটি ডুবে যেতে থাকে। এ অবস্থায় বন্ধুরা পরামর্শ দেন স্বর্ণমুদ্রাগুলো সমুদ্রে ফেলে দাও তাহলে ভালোভাবে সাঁতরাতে পারবে। ইউসুফ তা শোনেননি। ভারী বোঝা নিয়ে এক কিলোমিটার সাঁতরানোর পর তিনি ডুবে মরেন।

বলা হয়, কার মৃত্যু কখন ঘটবে তা জানার সাধ্য মানুষের নেই। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে হলেও কেউ কেউ নিজের মৃত্যু সম্পর্কে আগাম আভাস দিয়েছেন। অস্ট্রিয়ার নামি সংগীতজ্ঞ ছিলেন আরনল্ড স্কনবার্গ। ১৩ সংখ্যাটিকে আন লাকি থার্টিন বলে অভিহিত করা হলেও তার জীবনের সঙ্গে এই সংখ্যার অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল। স্কনবার্গের জন্ম ১৮৭৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। তিনি বলতেন তার মৃত্যুর সঙ্গেও ১৩ সংখ্যাটির যোগ থাকবে। শেষ পর্যন্ত সে কথাটিই সত্য হয়। ১৯৫১ সালের ১৩ জুলাই স্কনবার্গ মৃত্যুবরণ করেন। রাত তখন ১১টা ৪৭ মিনিট। অর্থাৎ মধ্যরাতের ঠিক ১৩ মিনিট আগে। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৭৬। এখানেও রয়েছে ১৩-এর প্রভাব (৭+৬=১৩)। অবাক করা মৃত্যুই বটে।

লেখক : এম এ কবীর সাংবাদিক, কলামিষ্ট, সমাজচিন্তক, গবেষক।

এ জাতীয় আরো সংবাদ