আজ শনিবার,৯ই মাঘ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,২৩শে জানুয়ারি ২০২১ খ্রিস্টাব্দ,ভোর ৫:১৯

কুরবানীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাসয়ালা

Print This Post Print This Post

কুরবানী যাদের উপর ওয়াজিব হয়:

১০ই যিলহজ্জ ফজর থেকে ১২ই যিলহজ্জ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মাঝে প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থমস্তিস্ক যে নর-নারী প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে ৫২ তোলা রুপার সমমূল্য পরিমাণ সম্পদের মালিক হবেন তার উপর কুরবানী ওয়াজিব। সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমমূল্যকে কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার নেসাব বলা হয়।এ নেসাব পরিমাণ সম্পত্তি আছে কি না সেটা নিরুপন করার ক্ষেত্রে টাকা-পয়সা, সোনা ও রুপার অলংকার,ব্যবসায়িক পণ্য, অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র এসব কিছুর মূল্য হিসাবযোগ্য। (মুসলিম হাদীস নং ৩১৪)।

নাবালেগ পাগল ও মুসাফিরের উপর কুরবানী ওয়াজিব হয় না। (বাদায়েউস সানায়ে ১৯৫, ১৯৬ পৃঃ)।

পূর্বে মালিকানাধীন কোন পশু কুরবানীর নিয়ত করলে শুধু নিয়তের কারণে কুরবানী ওয়াজিব হয়ে যায় না।তবে কুরবানীর দিনগুলোতে কোন দরিদ্র ব্যক্তি পশু ক্রয় করার সময় কুরবানীর নিয়ত করলে তা ওয়াজিব হয়ে যায়। (আলমগীরি, ৫/২৯১)।

কোন ধনী ব্যক্তি কুরবানীর দিনগুলোতে যদি কুরবানী না করে ইন্তেকাল করেন তবে তার ওয়াজিব কুরবানী রহিত হয়ে যায়। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া,৪/৩০৯)।
এখানে উল্লেখ্য যে, কুরবানী সামাজিক স্টেটাসের কারণে নয় বরং কুরবানীর দিনগুলোতে সামর্থের কারণে ওয়াজিব হয়। সুতরাং করোনার দোহাই দেয়ার সুযোগ কোন সামর্থবানের নেই।

কুরবানীর সময়:

১০, ১১ ও ১২তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানী করা যায়।তবে প্রথমদিন করা উত্তম। (মুয়াত্তা মালেক, হাদীস নং- ১৮৮)।

যদি কেউ উক্ত দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারে তাহলে কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করার পরও কোন কারণে সেটা উক্ত দিনগুলোতে জবাই করতে না পারে তবে তা জীবিত সদকাহ করে দিতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২১)।

যদি কুরবানীর দিনগুলো অতিবাহিত হওয়ার পর এ পশু জবাই করে ফেলে তাহলে গোশত সদকা করে দিতে হবে।এখানে মনে রাখতে হবে যে,যদি গোশতের মূল্য জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায় তাহলে যে পরিমাণ মূল্য হ্রাস পেয়েছে তাও সদকাহ করে দিতে হবে।(আদ্দুররুল মুহতার, ৬/৩২০)।

কারো যদি জীবনে অনেক অনাদায়ী ওয়াজিব কুরবানী থেকে যায় তবে সে প্রত্যেক বছরের জন্য একটি মাঝারি ধরণের ছাগলের মূল্য সদকা করে দিবে। (আলবাহরুর রায়েক, ৮/৩৫০)।

উল্লেখ্য, যার উপর কুরবানী ওয়াজিব সে যদি কুরবানীর জন্তু জবাই না করে গরীব মিসকিনকে দান করে দেয় তাহলে কিন্তু তার কুরবানী আদায় হবে না।(ফতাওয়া শামী, ৬/৩১৩)।

কুরবানীর পশু:

এক পা মাটিতে রাখতেই পারে না বা ভর করতে পারে না এমন পশু, যে জন্তু এতো দুর্বল যে জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত যেতে পারে না, দাতহীন বা এতো বেশী পড়ে গেছে যে খাদ্য চিবাতে পারে না, গোড়া থেকে শিং ভেঙে গেছে এবং মস্তিস্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে পশুর,অন্ধ,লেজ বা কান এক তৃতিয়াংশের পরিমাণ কাটা এ জাতীয় পশু দ্বারা কুরবানী জায়েয নয়।(বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪,২১৫)। তবে বন্ধা পশু দ্বারা কুরবানী করা জায়েয। (রদ্দুল মুহতার, ৫/৩২৫)।

কুরবানীর পশু গর্ভবতী হলে করণীয়:

প্রসবের সময় আসন্ন হলে তেমন গর্ভবতী পশুর কুরবানী মাকরুহ। (রদ্দুল মুহতার,৬/৩২২)
তবে গর্ভবতী পশু দ্বারা কুরবানী করা জায়েয। (মুয়াত্তা মালেক, হাদীস নং-১৮৬)

কুরবানীর পশু জবাই করার পূর্বে বা পরে যদি বাচ্চা প্রসব করে তাহলে তা জীবিত সদকা করে দেয়া উত্তম।( কাযীখান,৩/২৪৯) যদি উক্ত বাচ্চা জবাই করে তবে তার গোশত সদকা করে দিতে হবে। (রদ্দুল মুহতার,৬/৩২৩)। এ বাছুর যদি কুরবানী দাতা নিজের কাছে রেখে বড় করে ভবিষ্যতে কোন ওয়াজিব কুরবানী করে তবে তা আদায় হবে না।বরং সদকাহ করা সর্ববস্থায় জরুরী। (ফতোয়ায়ে রহিমিয়া,১০/২৭)

কুরবানীর পশুতে শরীর হওয়ার শেষ সীমা:

পশু জবাইয়ের পূর্ব পর্যন্ত শরিক হওয়ার বা শরীক নেওয়ার সুযোগ থাকে।জবাইয়ের পর শরীক হলে তার কুরবানী বৈধ হবে না। (আলবাহরুর রায়িক,৮/৩৪৬)
উল্লেখ্য, শরীকানা কুরবানীতে কোন শরীকের টাকা এক সপ্তমাংশের চেয়ে কম হলে কারো কুরবানী বৈধ হবে না। (কিফায়াতুল মুফতি,৮/১৮৬)।

কুরবানীর পশু ছোট বড় সবাই জবাই করতে পারবে। জবাইয়ের পদ্ধতি জানা থাকলে এবং সামর্থ থাকলে মহিলারাও জবাই করতে পারবে। (বুখারী,হাদীস নং-৫৫০৪। আলইযতেযকার,১৫/২৩৪)।

কুরবানীর গোসত সবাইকে দেয়া যায়। হিন্দু,খৃষ্টান বা অন্য যেকোন ধর্মের মানুষকেও দেয়া যায়।(ইলাউস সুনান,১৭/২৮৩)।

করোনা কালে আশেপাশের অভাবী মানুষগুলোর নিকট গোশত পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হবে।বিশেষ করে যেসব অভাবীরা হাত পাততে পারে না,তাদের কাছে গোপনে গোশত পৌঁছিয়ে মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত গড়ার সময় এবারের কুরবানী। আল্লাহ সবাইকে তাওফীক দিন।(আমীন)

লেখক : মুফতি ইলিয়াস আলমগীর, মুহতামিম, কাতলাগাড়ী কওমী মাদরাসা। শৈলকুপা, ঝিনাইদহ।

এ জাতীয় আরো সংবাদ