আজ সোমবার,২৩শে ফাল্গুন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,৮ই মার্চ ২০২১ খ্রিস্টাব্দ,রাত ১০:১৬

ভাষা আন্দোলনের ৬৯ বছর ও বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ

Print This Post Print This Post

মোমিনুর রহমান (মমিন) :
ভাষা আন্দোলন তথা বাংলা ভাষা আন্দোলন। বাঙালি ও বাংলাদেশীদের সর্বপ্রথম সফল আন্দোলন। যার ফলস্বরুপ বাংলা আজ আমাদের মায়ের ভাষা অর্থাৎ মাতৃভাষা। বাংলা হলো পৃথিবীর একমাত্র ভাষা যা রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত ও প্রতিষ্ঠিত। আর এজন্যই বিশ্বের বুকে বাংলা একটি অতি জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভাষা সেই সাথে বাংলা ভাষা আন্দোলন জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি পেয়ে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বময় পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। এটি বাঙালি ও বাংলাদেশিদের জন্য অত্যন্ত গৌরবেরও বটে। বাংলা ভাষা আন্দোলনটি মূলত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা নিয়েই শুরু হয়। বাংলাকে “রাষ্ট্রভাষা” করা নিয়ে দর কষাকষি ও মনোমানিল্য শুরু ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের অনেক আগে থেকেই । ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ঐ বছরের ডিসেম্বর মাসে কারাচীতে অনুষ্ঠিত এক শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর পূর্ব বাংলায় প্রতিবাদ ও আন্দোলন ঘনিভূত হতে শুরু করে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ আন্দোলনের অংশ হিসেবে প্রতিবাদ সভা ও হরতাল পালনের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদসহ ৬৯ জনকে গ্রেপ্তার করলে আন্দোলন আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়।

সর্বশেষ ১৯৫২ সালের ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও আব্দুল জব্বার, রফিক উদ্দিন, আব্দুস সালাম, বরকত, অহিউল্লাহ নামের একজন ৮/৯ বছরের কিশোরসহ আরও অনেকের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত আজকের আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস (সূত্রঃ উইকিঃপিঃ ও বিভিন্ন পুস্তক)।

এত এত আন্দোলন, রক্ত ও জীবনের বিনিময়ে যে ভাষাটি অর্জিত সেই ভাষাটি কি বাংলাদেশের মানুষ রক্ষা করছে? সেই ভাষাটি কি যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করছে? দিনের পর দিন অবহেলা ও অগ্রাহ্য করতে করতে আমাদের মায়ের ভাষাটি হারিয়ে ফেলছি নয়তো? ক্রমান্বয়ে বাংলা ভাষা থেকে আমরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি নয়তো? বাংলা ভাষা তথা আমাদের মাতৃভাষার স্থানটি ইংরেজির ভাষার কাছে ছেড়ে দিয়ে ইংরেজি ভাষাকে আমরা এতোটাই চর্চা করছি যে মাঝে মধ্যে বাংলাকে বিকৃতি ও অপমানিত করতেও দ্বিধাবোধ করছিনা। আমাদের জীবনের সাথে ইংরেজিকে এতোটাই আকঁড়ে ধরেছি যে বাংলা এখন পরোক্ষভাবে আমাদের দ্বিতীয় ভাষাতে পরিনত হয়েছে আর ইংরেজি প্রথম ভাষা। যার প্রতিফলন ঘটছে ব্যক্তিপর্যায়ে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমনকি সরকারী বিভিন্ন পদক্ষেপেও। বিশেষ করে আমাদের অভিজাত শিক্ষিত সমাজে বাংলাকে এতোটাই হেয়ো করা হয় যে কেউ যদি তার কথা-বার্তা কাজ-কর্মে ইংরেজি ভাষার প্রাধান্য দেখাতে না পারে তাহলে তাকেতো অশিক্ষিত-মূর্খ বলে গালি দেওয়া হয়। আর এদের দেখাদেখি এখন দেশের অজপাড়াগায়েও এর হাওয়া লাগতে শুরু করেছে। হ্যাঁ, এটা সত্য যে বিশ্বায়নের এই যুগে আধুনিকতার সাথে খাপ খাওয়াতে ও তাল মেলাতে এবং চাকরীর বাজার ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে ইংরেজি ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এমনকি বাধ্যতামূলকও। দেশকে ও দেশের অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাও আয়ত্ব করতে হবে। তাই বলে বাংলাকে উপেক্ষা করে, বাংলাকে ঐচ্ছিক ভাষা হিসেবে গণ্য করে?

বাংলা ভাষার চর্চা, গবেষণা ও ব্যবহার নিশ্চিত করণে ১৯৫৫ সালে “বাংলা একাডেমী” গঠন করা হয়। । বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৬০ সাল থেকে প্রবর্তন করা হয় “বাংলা একাডেমি পুরস্কার” । ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে ১৯৭৬ সাল থেকে “একুশে পদক “ নামে বাংলাদেশের জাতীয় এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে শহরে শহরে পালিত হয় মাস ব্যাপি বই মেলা, বিভিন্ন প্রকার অনুষ্ঠান, ঘটা করে শুরু হয় ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার আদ্যপান্ত নিয়ে আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ। এতো এতো প্রতিষ্ঠান, পুরুষ্কারসহ নানাবিধ আয়োজন করেও বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখার জন্য কিংবা বাংলা ব্যবহার নিশ্চিতকরণের কোন ফলপ্রসূ পদক্ষেপ কি আসলেই নিতে পেরেছে!! জীবন জীবিকার তাগিদে ও সমাজে নিজের অস্তিত্বকে জানান দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইংরেজি আয়ত্ব করতে গিয়ে বাংলা তথা মায়ের ভাষাটির অত্যাবশ্যকতা ভুলে যাচ্ছি। ব্যক্তিপর্যায়ে কিংবা সরকারী কোন উদ্যেগগুলো আসলেই কি কোন প্রকার ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারছে? শহর, বন্দর, গ্রামগঞ্জের প্রায় সকল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হচ্ছে ইংরেজি নামে। যদিও প্রতিষ্ঠানের নামকরণে বাংলা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে সরকার একটি আইন করে দিলেও সেই আইনটি কোথাও মানা হচ্ছে না এমনিক সরকারী ভাবে আইন বাস্তবায়নের কোন ভূমিকাও পালন করা হচ্ছেনা। দেশের অধিকাংশ বেসরকারী ব্যাংকগুলো ইংরেজি নামে নামকরণ করা হয়েছে। এদিকে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মনে হয় বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষাকে প্রধান ভাষা হিসেবে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব নিয়েছে। বাংলাদেশে নামী-দামী ও ছোট-বড় শতাধিক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আছে যার সিংহভাগই ইংরেজি নামে নামকরণ করা হয়েছে। সরকারী বেসরকারী সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সবগুলো পাঠ্যপুস্তকই ইংরেজিতে মুদ্রিত, অর্থাৎ ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো হয়। যে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠগুলোতে জাতিকে ইংরেজি তথা একটি বিদেশী ভাষাকে গুলিয়ে খাওয়ানো হয় সেদেশের মায়ের ভাষা অদূর ভবিষ্যতে ঘোর অন্ধকারে হারিয়ে যেতে চলেছে বৈ কি!!!

বিশ্বের প্রায় প্রতিটা দেশই তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে নিজেদের ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করে থাকে অথচ বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র। চীন ও জাপানের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে তারা তাদের নিজস্ব ভাষাকে কতটা ভালবাসে ও ব্যবহার করে। চীনের অভ্যন্তরে সকল ক্ষেত্রে শুধুমাত্র তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করা হয়। চীনের তৈরি বৈদ্যুতিক যন্ত্রসহ সকল পণ্য সারা পৃথিবীময় ব্যবহার করা হয় অথচ চীনারা নিজেদের জন্য সবকিছু আলাদা করে তৈরি করে থাকে যেখানে শুধুমাত্র চীনা ভাষা ব্যবহার করা হয়। চীনারা কখনোই নিজেদের মধ্যে অন্য ভাষায় কথা বলেনা। এমনকি অন্য দেশেও চীনারা নিজেদের ভাষার ব্যবহার করার চেষ্টা করে। বাংলাদেশের সরকারের সাথে চীনের বিশাল বাণিজ্য সম্পর্ক। চীনারা যখন বিশ্বের প্রায় প্রতিটা দেশই তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে নিজেদের ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করে থাকে অথচ বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র। চীন ও জাপানের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে তারা তাদের নিজস্ব ভাষাকে কতটা ভালবাসে ও ব্যবহার করে। চীনের অভ্যন্তরে সকল ক্ষেত্রে শুধুমাত্র তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করা হয়। চীনের তৈরি বৈদ্যুতিক যন্ত্রসহ সকল পণ্য সারা পৃথিবীময় ব্যবহার করা হয় অথচ চীনারা নিজেদের জন্য সবকিছু আলাদা করে তৈরি করে থাকে যেখানে শুধুমাত্র চীনা ভাষা ব্যবহার করা হয়। চীনারা কখনোই নিজেদের মধ্যে অন্য ভাষায় কথা বলেনা। এমনকি অন্য দেশেও চীনারা নিজেদের ভাষার ব্যবহার করার চেষ্টা করে। বাংলাদেশের সরকারের সাথে চীনের বিশাল বাণিজ্য সম্পর্ক। চীনারা যখন বাংলাদেশের সাথে কোন ব্যবসায়িক চুক্তি স্বাক্ষর করে তখন ইংরেজির পাশাপাশি যতখানি সম্ভব নিজেদের ভাষাও অন্তর্ভূক্ত করে দেয়। চীনা নাগরিক যখন অন্য কোন দেশে চাকরি করে তখনও তারা একজন দো-ভাষীর সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করে তবুও নিজের ভাষা ছেড়ে অন্য ভাষা আয়ত্ব করতে আপত্তি করে। অথচ আমরা আমাদের গর্বিত ভাষাটি দেশের অভ্যন্তরেই ব্যবহার করতে অস্বস্তিবোধ করি। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ৪০-৫০ বছর পরে বাংলা ভাষার অবস্থান কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা খুব ভালভাবেই অনুমান করাই যায়। এর দায়ভার কেউই এড়াতে পারেনা। মাতৃভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব ব্যক্তি, রাষ্ট্র তথা সরকারসহ সবাইকেই নিতে হবে। যার যার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টায় বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : মোমিনুর রহমান (মমিন), চাকুরীজীবি, শৈলকুপা, ঝিনাইদহ।

এ জাতীয় আরো সংবাদ