আজ শুক্রবার,৭ই কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,২৩শে অক্টোবর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,সকাল ৭:৫৬

শরিয়ত ছাড়া মারফত, ভক্ত ছাড়া গুরু

Print This Post Print This Post

শরিয়ত ছাড়া মারেফত হয় না, নারী ছাড়া চলে না পুরুষ, আবার ভক্ত ছাড়া দাম নেই গুরুর । সারা রাতের তর্কবিতর্ক এভাবেই শেষ করেন তারা। মূল মেসেজ হলো- রাতব্যাপী যে যুক্তি তর্ক শুরু করেছিল তা শুধু দর্শক ধরে রাখার জন্য। সমাজে কৃত্রিম ব্যক্তিত্বের সংখ্যাই বেশী। এদের সামাজের শিরোমণি বলা হয়। তবে এদের এ ব্যক্তিত্ব কৃত্রিম হলেও এর একটি বৈষয়িক মূল্য আছে। ব্যক্তিত্ব যেহেতু মানুষকে বড় করে তোলে, তাই পদমর্যাদার সাথে যদি কর্মদক্ষতার সামঞ্জস্য না থাকে তাহলে তার এ কৃত্রিম ব্যক্তিত্ব কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপত্তির কারণ হতে পারে। পালা গান এখনো আছে। শীত মৌসুমে এসব পালা গানের আসর বেশ জমে উঠে। বয়াতিরা ব্যস্ত হয়ে উঠেন। বয়াতিদের আবার বাউল শিল্পী হিসেবেও চেনেন অনেকে। পালা গানে দু‘টি পক্ষ থাকে। একজন থাকেন শরিয়ত নিয়ে,অন্যজন মারেফতের পক্ষে। দেখা যায়-একজন নারী অন্যজন পুরুষের পক্ষে। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে ব্যক্তি কেবল সমাজের একজন সভ্য নয়। তার থেকেও বেশি। একটি আত্মা। মনোবিজ্ঞানের ব্যক্তি হচ্ছে বুদ্ধি এবং আবেগের বিশিষ্ট প্রকাশ সমন্বিত চরিত্র। মনোবিজ্ঞানী আলফ্রেড এ্যাডলার (অষভৎবফ অফষবৎ, ১৮৭০-১৯৩৮ ) ব্যক্তিকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ চরিত্র বলে উল্লেখ করেছেন।

কখনো কখনো গুরু-শিষ্য হয়ে লড়ে যান দু’জনে।কেউবা হাশর আবার কেউ কেয়ামত নিয়ে মুখোমুখি হন। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় রাত শেষে। গোটা রাত লড়ে যান দু’জনে । গানের লড়াই। যুক্তির লড়াই। একে অপরকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন। উত্তর দিতে গিয়েও অপরকে খোঁচা মারেন। এসবই বয়াতিদের কৌশল। তবে সবচেয়ে বড় কৌশল যেটি তা হলো-সবশেষে দু’জন এক সুরে গান ধরেন।
সমাজ বিজ্ঞানীরা সামাজের পাশে ব্যক্তিকে এবং ব্যক্তির পাশে সমাজকে দাঁড় করিয়ে ব্যক্তির স্বরূপটি তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। মনোবিজ্ঞানীরা ব্যক্তির পাশে মনের ব্যাপার তুলে ধরেন। জ্ঞানের ফ্রাগমেন্ট অনুসারে সমাজে দু’শ্রেণির মানুষ আছে, যাদের মধ্যে কোনো বুদ্ধি নেই। তবে এ সংখ্যা খুবই কম। পৃথিবীতে চলতে হলে কেউই একা চলতে পারে না। একা চলতে গেলে হোঁচট খেতে হয়। একবার এমনই এক পালা গানের আসরে শরিয়তের এক বয়াতি গান ধরলেন-
বাঘের সাথে দিতে পাল্লা/বকরি দিলে ছাড়ি/আরে রান সিনা খাইয়া শেষে/পাঠাই দিমু বাড়ি। উত্তরে মারেফতের বয়াতি উঠে জবাব দিলেন – মারেফত হয় বিশ^বিদ্যালয়/বুঝবে কি তত্ত্ব/ শরিয়ত প্রাইমারির ছাত্র/ওরে শরিয়ত প্রাইমারির ছাত্র…।

সমাজের ভিত্তিই হচ্ছে ব্যক্তি। সমাজের বাইরে ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তি ঘটতে পারে না। কারণ ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে সামাজিক আচার আচরণের মধ্য দিয়ে। ব্যক্তির একটা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তার কাজের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে যা ব্যক্তিত্বের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে তাকে চিহ্নিত করে।

শীত মৌসুমের পালা গান এখন ছড়িয়ে গেছে সর্বত্র। সবখানে। বাউল আসরে তা আর সীমাবদ্ধ নেই। রাজনীতিতেও এ পালা গানের আসর জেঁকে বসেছে এক নিদারুনভাবে। সেখানে শুধু কথার ফুলঝুরি। কে কাকে কীভাবে শায়েস্তা করতে পারবে তার হিসেবনিকেশ। সঙ্গে আছে কৌশল। কথার যুদ্ধ তো আছেই। পালা গানের আসরে শেষ মুহূর্তে দুই বয়াতি এক সুরে কথা বললেও রাজনীতির মঞ্চে এক সুরের অস্তিত্ব নেই। পালা গানের আসরে দুটি পথ দু’দিক থেকে এসে এক হয়। আর রাজনীতির আসরে এক পথ দু’দিকে এঁকে বেঁকে চলে দৃষ্টিকটুভাবে। রাজনীতিতে একে অন্যের প্রতি বিশ্বা হারিয়ে গেছে। আস্থা উঠে গেছে। স্বার্থ বাসা বেঁধেছে। ফিরে আসি সেই পালা গানের আসরে। তুমুল লড়াই চলছে দুই বয়াতির মাঝে। কথার যুদ্ধে একে অন্যকে হারানোর। এরই মাঝে এক বয়াতি গান ধরলেন- উপরে তার মধু মাখা/ ভেতরে গরল/ আইল যে কলির আমল/ ঈমান আলী চইলা গেল/সব মতলব আলীর দল। চারদিকে দর্শকের হাততালি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে দুই বয়াতির যুক্তি-পাল্টা যুক্তি। এরই মধ্যে কোন ফাঁকে যে রাত শেষ হয়ে গেছে দর্শক বুঝতেই পারেনি। হঠাৎ দুই বয়াতি এক সঙ্গে দাড়িয়ে গান ধরে- পর মানুষে দুঃখ দিলে/ দুঃখ মনে হয় না/ আপন মানুষ কষ্ট দিলে/ মেনে নেয়া যায় না/ দিব না দিব না বন্ধু/আর দুঃখ দিব না/ কত ভালোবাসি তোমায়/ সে কি বন্ধু বুঝ না…।
এক সুরে গান গেয়ে পালা গানের সমাপ্তি হলেও রাজনীতির মঞ্চে এক সুরে গান কখন শুনতে পাবে দর্শক? সে পর্যন্ত চাই অপেক্ষা। রাতের পর রাত, দিনের পর—–।

ব্যক্তিত্বের মূল উৎস হচ্ছে মানসিকতা। মনোবিজ্ঞানে যে উপাদন দিয়ে ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে তার পিছনে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বুদ্ধি এবং আবেগের যার মাধ্যমে গড়ে ওঠে মানসিকতা। মানসিকতা আবার নিয়ন্ত্রিত হয় মন দ্বারা, যেখানে জ্ঞানের ভূমিকা আছে। তূর্ণা যখন এসএসসি পরীক্ষার্থি ঠিক তখন তার বাবা স্ট্রোক করে মারা যান। বাবা যখন মারা যান তখন তার ছোট ভাই তুহিন ক্লাস ফাইভের ছাত্র। বাবাই ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সংসার চালানোর ভারটা স্বভাবতই মায়ের কাঁধেই চেপে বসে। বাবার মৃত্যুতে তুর্ণার মা সুফিয়া খুব কেঁদেছিল। তবে মৃত্যু শোকে নয়। ভবিষ্যতে টিকে থাকার কথা ভেবে। বেঁচে থাকার সংগ্রামের পথটি বন্ধুর, আঁধারে ঢাকা, কণ্টকাপূর্ণ। তূর্ণার বাবা পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিলেন বলে বাবার বাড়িতে তার শেষ পর্যন্ত ঠাঁই হয়নি। শহরে একাই একটা ভাড়া বাড়িতে সুফিয়াকে নিয়ে তূর্ণার বাবা মেরাজ সংসার পেতেছিলেন।

মেরাজ সাহেব একটা বে-সরকারী কলেজে চাকরি করতেন। তিনি ছেলে মেয়েদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন – তাদের মানুষের মতো মানুষ করবেন। তার মৃত্যুতে সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সামাজিক জীবনে ব্যক্তির যে সুস্থ এবং মননশীল মানসিকতা বাহ্যিক আচরণের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় তাকেই ব্যক্তিত্ব বলা যায়।’ আমরা যদি সুস্থ এবং মননশীল বিষয়টি বাদ দিয়ে ব্যক্তিত্বের সংজ্ঞা দেই, সে সংজ্ঞা যথার্থ হবে না। আমরা যখন বলবো, লোকটা খুবই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তবে মনে করতে হবে তার আচার আচরণ মার্জিত, সব কিছু রুচিশীল। তূর্ণার বড় মামা বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। শহরতলীতেই তাদের বাসা।

একদিন সুফিয়া বড় ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে আসন্ন বিপদের কথা খুলে বলে। বোনের সবকথা শুনে ভাই সুফিয়াকে সান্তনা দিয়ে বলেন, “দেখ সংসারে আমারও টানাটানি আছে। আমি যতটুকু পারি তোকে সাহায্য করব। আপাতত তুই তূর্ণাকে আমার এখানে দিয়ে যা। ও আমার কাছে থেকে পড়ালেখা করবে। আমার বন্ধুর ক্লিনিকে তোকে একটা কাজ জোগাড় করে দেব। হাজার পাঁচেক টাকা বেতন পাবি।”

ভাইয়ের এই সাহায্যটুকু পেয়ে আনন্দে সুফিয়ার দুই চোখ জলে ভরে গিয়েছিল। সীমাহীন অভাবের সাগরে যে সুফিয়া হাবুডুবু খাচ্ছিল সেই সুফিয়াই তীরের দেখা পেয়েছে। নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন আবার বুকে বাসা বেঁধেছে।

তূর্ণা যেদিন শুনেছিল তাকে মামার বাড়িতে থাকতে হবে সেদিন রাতে তার ঘুম হয়নি। সারারাত মুখ লুকিয়ে কেঁদেছিল। কোনভাবেই সে কান্নাকে রোধ করতে পারছিল না। সকালবেলায় তার দুচোখ ফোলা দেখে মা উপলব্ধি করেছিল তার বুকের কষ্টগুলোকে। মেয়েকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে কান্না জড়িত কণ্ঠে মা বলেছিল,তুই যা মা। মন খারাপ করিস নে। আমি মাঝে মাঝে গিয়ে তোকে দেখে আসব। ললাটের লিখন মেনে নিতে হয়। দেখবি এখানেই তোর মঙ্গল রয়েছে। কাঁদিসনে।

: সবুজকে না দেখলে যে আমি থাকতে পারব না।
: দেখবি দু’দিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে। মন খারাপ করিসনে। একটু শক্ত ‘হ।

প্রথমদিকে মামার বাড়িতে তূর্ণার মোটেও মন টেকেনি। সবসময় বুকের কান্নাগুলো চিৎকার করে বাইরে বের হয়ে আসতে চাইত। কণ্ঠের দ্বার রুদ্ধ হওয়ার কারণে বের হতে পারেনি। কিন্তু তূর্ণাকে একটু একা পেলেই কান্নাগুলো নীরবে চোখ দিয়ে ঝরে পড়ত। নিজেকে হালকা করার জন্য মামার বাড়ির ছাদের এক কোনায় চুপটি করে বসে থাকত তূর্ণা। মামার ছোট ছেলেটা মাঝে মাঝে তূর্ণার সাথে খেলা করে। ও-ই তূর্ণার একমাত্র খেলার সঙ্গী। প্রাইভেট পড়তে আসা ছেলেমেয়েদের সাথে তাকেও পড়তে হয়। এতেও তার সময়টা বেশ ভালোভাবে কেটে যায়। মাসে একবার হলেও মা দেখতে আসে। মা এলে মায়ের সাথে যাওয়ার জন্য তার মনটা কেমন আনচান করতে থাকে।

জ্ঞান যেমন মনের প্রধান উপাদান, জ্ঞান এখানেও তেমনি ব্যক্তিত্বের মূল উপাদান হিসেবে ভূমিকা পালন করে। ব্যক্তিত্বের দ্বিতীয় প্রধান উপাদান হচ্ছে অনুভূতি। যাদের অনুভূতি কম তারাই সাধারণতঃ ব্যক্তিত্বহীন হতে পারে। জ্ঞানীরা অনুভূতিসম্পন্ন বলেই তাদের মান সম্মানবোধ থাকে প্রখর। মান সম্মান সম্পর্কে সচেতন বলেই ব্যক্তিত্বকে ছোট করতে পারে এমন কাজ থেকে তারা বিরত থাকেন। জ্ঞানী লোক ব্যক্তিত্বহীন হতে পারে না কিন্তু ব্যক্তিত্বহীন লোক পশুও হতে পারে।

এভাবে দেখতে দেখতে একদিন তূর্ণা এসএসসি পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়। অন্যান্য বন্ধু-বান্ধবের চেয়ে তূর্ণা একটু ভিন্ন স্বভাবের। নিরিবিলি থাকতেই সে বেশি পছন্দ করে। একদিন কলেজের হাবিব নামে এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সে অনার্স ফাইনাল এয়ারের ছাত্র। সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান। তার বাড়ি মামাদের পাড়াতেই। পরিচয়ের পর থেকেই কারণে অকারণে তূর্ণার সাথে হাবিবের প্রায়ই দেখা হত। হাবিবের প্রতি তূর্ণার মনের গহীনে ভালো লাগার যে বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল তা যেন কোনভাবেই বৃক্ষে পরিণত হতে না পারে সেই চেষ্টাই তূর্ণা সবসময় করত। সে জানত দরিদ্রতার পদতলে ভালোবাসা পিষ্ট হয়। তূর্ণার মতো হতভাগা কোন নারীর হৃদয়ে ধনীর দুলালের প্রতি ভালোবাসার জন্ম মানেই দুঃসহ পরিণতির জন্ম দেয়া। তাই হাবিব ভাইয়ের কথা সে কোনভাবেই মনে করতে চাইত না।

ছোটবেলা থেকেই হাবিবের প্রেম ট্রেমের প্রতি আগ্রহ ছিল না। বলতে গেলে এখনও নেই। তবে একথাও সত্য কোন মেয়েও তার হৃদয়কে নাড়া দিতে পারেনি। ছাত্রজীবনেও তার সঙ্গে অনেক মেয়ের পরিচয় হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই রূপবতী,ধনীর দুলালী। তবে কেউই হাবিবের নজর কাড়তে পারেনি। তূর্ণার সঙ্গে হাবিবের পরিচয় দুই একদিনের। তূর্ণার সঙ্গে কয়েকদিনের কথাবার্তা আর চোখাচোখিতেই হাবিবের হৃদয়ের গভীরে এক অদ্ভূত ভালোলাগার অনুভূতির উন্মেষ ঘটে। শ্যামবর্ণের লাজুক কিশোরী মেয়ের প্রতিটি বিষয়ই তাকে মুগ্ধ করেছে প্রতিনিয়ত। তার নজরকাড়া ডাগর আঁখির চাহনির কাছে হাবিবের সবকিছু হার মেনেছে। সেই আঁখির মাঝেই সে খুঁজে পেয়েছে প্রশান্তির নীড়। যার জন্যই যেন তার জন্ম হয়েছে। কলেজ ক্যাম্পাসে এলেই হাবিবের দু’চোখের দৃষ্টি অস্থির হয়ে ছুটোছুটি করতে থাকে। সে দৃষ্টি কোন জায়গায় ঠাঁই করে নিতে চায়। দৃষ্টির আঙিনায় তূর্ণার ছায়া পড়লেই সেই ছায়াতে দৃষ্টিটা শান্ত-সুস্থিরভাবে আটকে যায়। হাবিবের ইচ্ছে হয় তূর্ণার একটি হাত তার করযুগলে বন্দী করে নির্জনে বসে কিছুক্ষণ গল্প করতে। কিন্তু সেই কথা সে প্রকাশ করতে পারে না। পরক্ষণেই চিরাচরিত স্বভাবে ফিরে যায়। এভাবেই মনের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের যুদ্ধ চলে। অবশ্য একই যুদ্ধ তূর্ণার মনের মধ্যেও চলতে থাকে। কোন কথাই সে মুখে প্রকাশ করতে পারে না। নয়নের ভাষার মধ্যেই সবকিছু সীমাবদ্ধ থাকে।

জ্ঞান দ্বারা ব্যক্তি যখন নিয়ন্ত্রিত হয় তখন সে পরিবেশকে জয় করতে পারে। ব্যক্তি যখন পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তখন সে চরিত্রহীন হতে পারে। ব্যক্তিত্বকে আমরা দুভাগে ভাগ করতে পারি ।
১. কৃত্রিম ব্যক্তিত্ব, ২. অকৃত্রিম ব্যক্তিত্ব।

হাবিবের পরিবার বনেদি পরিবার। তার আভিজাত্যের সঙ্গে তূর্ণার পরিবার বেশ বেমানান। তারপরও হাবিবকে বড্ড ভাবিয়ে তুলেছে তূর্ণা। মনটা কেমন যেন সবসময় উথালপাথাল করে। তূর্ণার প্রতি ভালোলাগার অদৃশ্য বন্ধনে আটকে যায় তার মন। মনের মধ্যে প্রবল একটা টান অনুভব করে। চোখের সামনে সে সবসময় তূর্ণার মায়াবী মুখশ্রী দেখতে পায়। তূর্ণাকে সে কোনভাবেই মন থেকে সরাতে পারেনা। যতই ভুলে থাকতে চায় ততই তূর্ণার স্মৃতি তাকে প্রবলভাবে গ্রাস করে। দেখতে দেখতে হাবিবের পড়াশুনাও একদিন শেষ হয়ে যায়। চাকরি পেতে তার বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। রেজাল্টের পর পরই একটা বেসরকারি কলেজে প্রভাষক পদে যোগদান করে। অবশ্য কলেজে চাকরির বিষয়টি তূর্ণা জানতে পারেনি।

ওদিকে তূর্ণারও এইচএসসি পরিক্ষা শেষ হয়ে যায়। ফলাফলের জন্য অপেক্ষা। তূর্ণা মায়ের কাছে যায় কয়েকটা দিন থেকে আসার জন্য। ইতোমধ্যে তার বেশ কয়েকটা বিয়ের প্রস্তাব মামা নিজ থেকেই না করে দিয়েছে। অবশ্য পরিক্ষায় পাশ করার পর আর কোনভাবেই দেরি করবে না মামা। বিয়ের পিঁড়েই তাকে বসতেই হবে। সে জানে তার পছন্দ অপছন্দের মূল্য কারোর কাছেই নেই। তার জন্য যে পাত্র ঠিক করা হবে সেই পাত্রকেই তাকে বিয়ে করতে হবে। গরিব অসহায় মেয়েকে কারোর বিয়ে করতে চাওয়া মানে তো কন্যা দায়গ্রস্ত মায়ের জন্য পরম পাওয়া। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তূর্ণার মামার বাড়িটা তার কাছে ভালো লেগে যায়। মামা-মামি তূর্ণাকে নিজের মেয়ের আদর-যতœ করে। তাই মামার বাড়িতে যাওয়ার জন্য তার মনটা আনচান করতে থাকে।
কোন এক না পাওয়ার বেদনা যেন তাকে সবসময় তাড়া করে বেড়ায়। মামার বাড়িতে গেলেই যেন তার বেদনাটা দূরিভূত হবে। আবার পরক্ষণেই সে নিজেকে প্রবোধ দেয়। ভালোলাগা,ভালোবাসার সকল সাধ জলাঞ্জলি দিয়ে সে নিজেকে শামুকের মতো খোলসের মধ্যে গুটিয়ে রাখে। সৃষ্টিকর্তার নিকট তূর্ণার শুধু একটুকু প্রার্থনা সে যাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাবে সে যেন কষ্ট না দেয়। ভালোবাসার চাদরে ঢেকে রাখে। দারিদ্র্য যেন তার জীবনকে বিষিয়ে না তোলে।
একমাত্র ছেলে হাবিবের মা-বাবা অস্থির হয়ে পড়ে পুত্রবধূ দেখার জন্য। ডজন খানেক পাত্রী দেখার পরও হাবিবের পছন্দ হয়নি একটিও। অবশেষে মা-বাবা বাধ্য হয়ে হাবিবকে বলেছে, তোর যাকে খুশি তাকে বিয়ে কর আমাদের আপত্তি নেই। অনুরোধ, তবুও একটা বিয়ে কর। অনেকটা নিশ্চিত হয়েই একদিন হাবিব মা-বাবাকে জানিয়ে দেয় তার পছন্দ তূর্ণাকে। তূর্ণাদের পরিচয় জানার পর হাবিবের মা-বাবা খুব অবাক হয়, তার পছন্দ এত নিচে নামে কীভাবে। তারা কখনও ভাবতেও পারেনি হাবিবের রুচিবোধ এত নিচে নামতে পারে। ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেন, ছেলের পছন্দকে অসম্মান করবে না। ছেলের পছন্দকে তারা মেনে নেয়। তবে আপাতত ঘটা করে ছেলেকে বিয়ে দেবেন না। প্রয়োজন হলে পরে বিয়ে বাজাবেন।

একদিন তূর্ণার মামার সঙ্গে হাবিবের মা-বাবা আলোচনা করে বিয়ের দিন ধার্য করেন। মামা ভালো পাত্র হাতছাড়া করতে ভুল করেননি। উভয়ের সম্মতিতে দু’দিন পরেই বিয়ের দিন ধার্য করা হয়।
বিয়ের দিন ধার্য হওয়ার পরও তূর্ণা জানত না কার সঙ্গে তার বিয়ে হচ্ছে। সে শুধু জানত মামাদের বাড়ির কাছেই ছেলেদের বাড়ি। ছেলেটি কলেজে চাকরি করে। নাম হাবিবুর রহমান। আর তার মামা তাকে বলেছে- তোর বড় কপাল। অনেক বড় ঘরের বৌ হবি তুই। তবুও বিয়ের কথা ভাবতেই তূর্ণার হৃদয়টা হু হু করে ওঠে। হৃদয়ে কালবোশেখীর ঝড় বইতে শুরু করে। কলেজ ক্যাম্পাসে হাবিবের কয়েকদিনের স্মৃতি তাকে বেশ পীড়াদেয়। ভাবতে ভাবতে দু’চোখের জল এমনিতেই গড়িয়ে যায়। বিয়ের পর তূর্ণা যখন জানতে পারে, ভালোবাসার প্রিয় মানুষটির সঙ্গেই তার বিয়ে হয়েছে। হাবিবুর রহমানের ডাকনাম শুভ। তখন সে আবেগে ফেটে পড়ে। মনটা আনন্দে নেচে ওঠে। ভাবে সে-ই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা লাভের পিছনে রয়েছে জ্ঞান। যে জ্ঞান অন্য কোনো প্রাণীর নেই। যার মধ্যে জ্ঞান আছে, তার শ্রেষ্ঠত্ব ব্যক্তিত্বে থাকবেই। এ কারণে ব্যক্তিত্বকে সুন্দর করতে হলে জ্ঞানের সাধনা প্রয়োজন। জ্ঞান মানুষকে ভালো মন্দের নির্দেশ দিয়ে থাকে এবং তা মেনে চলতে পারলেই সুন্দর ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া যায়।

লেখক : এম এ কবীর, সাংবাদিক, কলামিস্ট,
গবেষক, সমাজচিন্তক।

এ জাতীয় আরো সংবাদ